গলার ক্যান্সারের – প্রাথমিক লক্ষণ কী?

গলার ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে বলতে গিয়ে আমি দুটি অঙ্গের ক্যান্সার নিয়ে বলতে চাই। অঙ্গ দুটি হল থাইরয়েড গ্ল্যান্ড ও ভয়েস বক্স বা স্বরযন্ত্র। তবে শুধু প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে না বলে একটু বিস্তারিত ভাবেই লিখলাম। আশা করি, এতে একটা ভাল ধারনা তৈরি হবে।

প্রাথমিক আলোচনা

থাইরয়েড আমাদের শরীরের একটি বিশেষ রকমের গ্রন্থি যা গলার নিম্নাংশে ভয়েস বক্স বা স্বরযন্ত্রের নিচে এবং শ্বাসনালি বা ট্র্যাকিয়ার ঠিক সামনে থাকে। এই গ্ল্যান্ডের মধ্যে থাকে দু’টি লোব। লোব দু’টি ইসথমাস নামে একটি সংযোগ দ্বারা যুক্ত। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করে। যেমন, এমন কিছু হরমোন নিঃসরণ করে যা শরীরের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে স্বরযন্ত্র মানব শরীরের একটি সুক্ষ ও জটিল অঙ্গ। স্বরযন্ত্রের কার্যকারিতায় এতটাই সুক্ষ ব্যাপার থাকে যে, সামান্য তারতম্যে অনেক অসুবিধে হতে পারে।

থাইরয়েড ক্যান্সারের গুরুত্ব আলাদা

যদিও শরীরের সব গ্ল্যান্ডেই টিউমার হতে পারে তবু থাইরয়েড গ্রন্থির টিউমার ও ক্যান্সার আলাদা গুরুত্ব দাবী করে। কারণ বর্তমানে এই টিউমার সারা বিশ্ব জুড়েই খুব বেশি সংখ্যায় হচ্ছে। তাছাড়া এই ক্যান্সারের কয়েকটি বিশেষ দিক আছে, যা অন্যান্য ক্যান্সারের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী।

এই ক্যান্সারের সঙ্গে বয়সের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। ৪৫ বছরের কম বয়সী কারও থাইরয়েড ক্যান্সার হলে চিকিত্সায় খুব ভাল ফল মেলে। এমনকী সঠিক চিকিত্সায় রোগ সম্পূর্ণ সেরে যায়। দেখা গেছে, এদের ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই সুস্থ হয়ে ওঠেন। এর চেয়ে বেশি বয়সীদের চিকিত্সার ফলাফল ভাল, তবে প্রথমটির মতো নয়।

বেশিরভাগ থাইরেয়ড টিউমার আদতে ক্যান্সার নয়। দেখা গেছে, ১০টি থাইরয়েড টিউমারের মধ্যে মাত্র ১-২টি টিউমার ক্যান্সারে পর্যবসিত হয়। এই ক্যান্সার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, অন্যত্র ছড়ায় না।

থাইরয়েড ক্যান্সারের চরিত্র

যে ধরনের থাইরেয়ড ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি হয় তার নাম প্যাপিলারি ক্যান্সার অফ থাইরয়েড। এরা সাধারণত গলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, লিম্ফ নোডে ছড়ায় না। তবে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে লাঙস-এ ছড়াতে পারে। কম বয়সে ধরা পড়লে এই ক্যান্সার সেরে যায়।

আর এক ধরনের ক্যান্সার আছে নাম ফলিকুলার ক্যান্সার অফ থাইরয়েড। এরা সাধারণত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। এই ক্যান্সার লাঙস তো বটেই হাড়ে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আমরা জানি কোনও ক্যান্সার যদি হাড় বা লাঙস-এ ছড়ায় তবে তাকে স্টেজ ৪ ক্যান্সার হিসেবে গন্য করা হয় এবং যা নিরাময়যোগ্য নয়। ফলিকুলার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটি আলাদা। স্টেজ ৪ হওয়া সত্ত্বেও এই ক্যান্সার সঠিক চিকিত্সায় সেরে যায়। সুতরাং স্টেজ ৪ অন্য ক্যান্সার এবং স্টেজ ৪ ফলিকুলার ক্যান্সার অফ থাইরয়েড ক্যান্সারের চরিত্র একরকম নয়। যেমন, স্টেজ ৪ লাঙস ক্যান্সারে মৃত্যু অবধারিত হলেও এই ক্ষেত্রে সেই ভয় নেই।

মেডুলারি ক্যান্সার অফ থাইরয়েড প্রকৃতিতে কিছুটা বিরল। এরাও লাঙ বা শরীরের অন্যান্য জায়গায় ছড়াতে পারে। তবে অন্য থাইরয়েড ক্যান্সার থেকে এদেরও একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এদের পারিবারিক ইতিহাস থাকে। সাধারণত জেনেটিক ডিফর্মিটি থেকে এই ক্যান্সার হয়। সুতরাং পরিবারে কারও এই ক্যান্সার থাকলে অন্য সদস্যদের এই রোগ হতে পারে। শিশুদের মধ্যে মেডুলারি ক্যান্সার দেখা যায় এবং অনেক সময় জন্মগত ভাবেও তাদের এই রোগ হয়।

প্রকৃতিতে সবচেয়ে খারাপ প্রকৃতির যে থাইরেয়ড ক্যান্সার তার নাম অ্যানাপ্লাস্টিক ক্যান্সার অফ থাইরয়েড। এই আগ্রাসী ক্যান্সার গলার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই সঙ্গে শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়ায়। এটাই একমাত্র থাইরয়েড ক্যান্সার যার চিকিত্সা করেও সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয় না। তবে খুশির কথা এটাই যে এরা খুবই বিরল প্রকৃতির। খুব কম ক্ষেত্রেই এই ক্যান্সার হয়।

থাইরয়েড ক্যান্সারের লক্ষণ

থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে কোনও টিউমার হলে বাইরে থেকে বোঝা যায়। হাত দিয়ে অনুভবও করা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি আয়নার সামনে দাঁড়ালেই এর অস্তিত্ব বুঝতে পারবেন। ঢোক গিললে টিউমারটি ওপরের দিকে উঠে যাবে। কারণ যে স্ট্রাকচারের সঙ্গে এটি জড়িত (যেমন, খাদ্যনালি বা শ্বাসনালি) ঢোক গিললেই সেই গোটা স্ট্রাকচারটি ওপরে দিকে উঠে যায়। তাই থাইরয়েড টিউমার হয়েছে কিনা জানতে আপাত বিচারে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ক্যান্সারে কোনও ব্যথা হয় না। তবে টিউমারটি আকারে যত বড় হতে থাকে তত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। আর একটি ব্যাপার হল অনেক সময় গলার চারদিকে লিম্ফ নোড বিচির মতো ফুলে ওঠে। এটাকেও ক্যান্সারের লক্ষ্মণ বলে ধরতে হবে।

থাইরয়েড ক্যান্সার হলে গলার আওয়াজে একটা পরিবর্তন আসে। আর সেটা লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন। আসলে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড একটি বদ্ধ জায়গায় থাকে যার আশে পাশে থাকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং রেকারেন্ট ল্যারিঞ্জিয়াল নার্ভ। এই নার্ভটি স্বরযন্ত্রের মধ্যে গিয়ে ঢুকে ভোকাল কর্ডের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং ল্যারিঞ্জিয়াল নার্ভের ওপরে চাপ পড়লে গলার আওয়াজ বদলে গিয়ে ফ্যাশফ্যাশে হয়ে যায়। কারণ তখন ভোকাল কর্ড ঠিক মতো নড়াচড়া করতে পারে না।

টিউমারটি যদি শ্বাসনালিতে চাপ দেয় তাহলে শ্বাসকষ্ট হয়। অন্যদিকে টিউমার খাদ্যনালিতে চাপ দিলে গিলতে অসুবিধে হয়। এখানে একটা কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে একমাত্র অস্বাভাবিক ভাবে বড় না হয়ে উঠলে নন-ক্যান্সারাস সাধারণ টিউমার কিন্তু এই ধরনের কোনও চাপ দেয় না। দেখা গেছে সাধারণ ভাবে ক্যান্সারাস টিউমারের ক্ষেত্রেই ওই ঘটনাগুলি ঘটার সম্ভাবনা বেশি। এইরকম হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

থাইরয়েড ক্যান্সার শনাক্তকরণ

থাইরয়েডের সমস্যায় রুটিন ব্লাড টেস্ট এবং চেস্ট এক্স-রে ছাড়াও থাইরয়েডের টি-৩, টি-৪ ও টি এস এইচ পরীক্ষা করা হয়। এইগুলিতে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখলে রোগীকে প্রথমে কোনও এন্ডোক্রিনোলজিস্টের কাছে পাঠানো হয়। তিনি ওষুধ দিয়ে থাইরয়েডের কার্যকারীতা ঠিক করে দেন।

টিউমার শনাক্তকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা অবশ্যই এফ এন এ সি বা ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজি। এই পরীক্ষায় টিউমার অংশ থেকে কিছুটা রস নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয় সেটা ক্যান্সার কিনা। এতে ক্যান্সারের প্রকার সম্পর্কেও ধারনা করা যায়। তবে এফ এন এ সি বা নিডল বায়োপ্সির দ্বারা সবসময় নিশ্চিতভাবে রোগটি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। আর এই টিউমারের একমাত্র চিকিৎসা মানে যেহেতু সার্জারি, তাই অপারেশন করে প্রথমে টিউমারটিকে অপসারণ করা হয়। তার পরে বায়োপ্সি করলেই বোঝা যায় টিউমারটি ম্যালিগনেন্ট কিনা। থাইরেয়ড স্ক্যান বা রেডিও আইসোটোপ স্ক্যানও করা যেতে পারে। পরীক্ষার জন্য রোগীকে আয়োডিন খাইয়ে স্ক্যান করা হয়। এক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয়োডিন থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে পৌঁছে কোনও কোনও অংশে জমাট বাঁধতে শুরু করে। জমাট বাঁধা অঞ্চলকে হট নডিউল এবং জমাট না-বাঁধা অঞ্চলকে কোল্ড নডিউল বলে। কোল্ড নডিউলে কয়েক ধরনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। যাই হোক থাইরয়েড স্ক্যান থেকে ক্যান্সারের ব্যাপারে ধারণা করা গেলেও সেটি যে

ক্যান্সারই তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই এর সঙ্গে এফ এন এ সি কিংবা বায়োপ্সি করে নিশ্চিত হতে হয়। এছাড়া কখনও কখনও গলার সোনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান বা এম আর আই-ও করা হয়।

সেরাম থাইরো গ্লোবিউলিন নামে একটি রক্তের পরীক্ষা আছে। প্যাপিলারি ক্যান্সারে এই পরীক্ষা প্রাপ্ত ফল খুব ভাল। এটা টিউমারের একটি মার্কার। সেরাম ক্যালসিটোনিও একটি রক্তের পরীক্ষা যা মেডুলারি ক্যান্সারে করা হয়। তবে সব ল্যাবরেটারিত এইসব পরীক্ষা হয় না।

চিকিৎসা

অন্যান্য ক্যান্সারের মতো এখানেও তিন ধরনের চিকিৎসা হতে পারে। সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি। তবে এই ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বাস্তবে সার্জারিটাই মূল চিকিৎসা। অ্যানাপ্লাস্টিক ক্যান্সারের কয়েকটি বিশেষ প্রকার ছাড়া থাইরয়েড ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপির তেমন কোনও ভূমিকা নেই। এক কথায় বলা যায় এটা সার্জারি ডিপেন্ডেন্ট রোগ।

রোগী যদি কম বয়সী হন, টিউমারের সাইজ যদি ১.৫ সেমির কম হয়, যদি সেটি লো গ্রেডের ক্যান্সার হয় এবং লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে না পড়ে থাকে তাহলে থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের দু’টো লোব বাদ না দিয়ে একটি লোব বাদ দিলেই চলে। একে হেমিথাইরেক্টোটমি বলে। তবে ভবিষ্যতে বাকি থাকা লোবে যদি ক্যান্সার দেখা দেয় তখন কিন্তু পুরোটাই বাদ দিতে হতে পারে। অন্যদিকে বয়েস ৪৫-এর বেশি হলে, দু’টি লোবেই অল্পবিস্তর টিউমার থাকলে, ক্যান্সার লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে গেলে বা আয়তন ১.৫ সেমির চেয়ে বেশি হলে থাইরেক্টোটমি করা হয়, যার অর্থ পুরো থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বাদ দিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে থাইরক্সিন হর্মোনকে বাইরে থেকে রিপ্লেস করতে হয়। এটি বিভিন্ন নামে বাজারে পাওয়া যায় এবং দামেও খুবই স্বস্তা। তবে ওষুধটি কিন্তু জীবনভর খেয়ে যেতে হয়। সুতরাং গ্ল্যান্ড বাদ দিলে শরীরের বিরাট কিছু ক্ষতি হয় এমন নয়

গৌতম মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *